ভুলে যাওয়া: স্বাভাবিক প্রবণতা নাকি গুরুতর রোগ?
ভূমিকা
ভুলে যাওয়া মানুষের স্বভাবগত একটি বিষয়। দৈনন্দিন জীবনে ছোটখাটো ভুল—চাবি কোথায় রেখেছি, কারও নাম মনে না আসা কিংবা কোনো কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ ভুলে যাওয়া—এগুলো আমরা প্রায় সবাই অনুভব করি। কিন্তু যখন এই ভুলে যাওয়া ক্রমশ বাড়তে থাকে, দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে এবং ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তখন সেটি আর সাধারণ বিষয় থাকে না। তখন ভুলে যাওয়া রূপ নেয় একটি রোগে, যার নাম ডিমেনশিয়া।
ভুলে যাওয়ার ধরন
ভুলে যাওয়ার সমস্যা মূলত দুই ধরনের হতে পারে—অস্থায়ী এবং দীর্ঘমেয়াদি।
১. অস্থায়ী ভুলে যাওয়া (Acute Confusional State)
হঠাৎ করে স্বল্প সময়ের জন্য স্মৃতিভ্রংশ বা বিভ্রান্তি দেখা দিলে তাকে অ্যাকিউট কনফিউশনাল স্টেট বলা হয়। সাধারণত যেসব কারণে এটি হতে পারে—
-
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক
-
শরীরের লবণের ভারসাম্যহীনতা
-
মাথায় আঘাত
-
রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ কমে বা বেড়ে যাওয়া
এই ধরনের সমস্যায় সঠিক ও সময়মতো চিকিৎসা নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।
২. দীর্ঘমেয়াদি ভুলে যাওয়া (ডিমেনশিয়া)
যদি ভুলে যাওয়ার সমস্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হয় এবং দিন দিন স্মৃতি, চিন্তাশক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নষ্ট করে ফেলে—তবে সেটি ডিমেনশিয়া। এটি সাধারণত পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়, তবে চিকিৎসার মাধ্যমে এর অগ্রগতি ধীর করা সম্ভব।
কীভাবে বুঝবেন ডিমেনশিয়ার শুরু হয়েছে?
ডিমেনশিয়া হঠাৎ করে দেখা দেয় না। শুরুতে কিছু সূক্ষ্ম লক্ষণ প্রকাশ পায়, যেগুলো অনেক সময় আমরা গুরুত্ব দিই না।
ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলো হলো—
-
নিকট অতীত ভুলে যাওয়াসকালে কী খেয়েছেন, ওষুধ খেয়েছেন কি না—এসব মনে না থাকা, অথচ বহু বছর আগের ঘটনা স্পষ্টভাবে মনে থাকা।
-
একই প্রশ্ন বারবার করাএকই কথা বা প্রশ্ন অজান্তেই বারবার বলতে থাকা।
-
সমস্যা অস্বীকার করানিজের ভুলে যাওয়ার প্রবণতা মানতে না চাওয়া এবং এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়া।
-
আচরণ ও ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনহঠাৎ রেগে যাওয়া, অস্থিরতা, সন্দেহপ্রবণতা, ঘুমের সমস্যা।
-
ভাষাগত সমস্যাকথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া, বাক্য গুছিয়ে বলতে না পারা।
-
ভ্রম বা ভুল দেখা-শোনাএমন কিছু দেখা বা শোনা, যা বাস্তবে নেই।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে এসব লক্ষণকে অনেক সময় “বয়সজনিত স্বাভাবিক পরিবর্তন” ভেবে অবহেলা করা হয়। কিন্তু অবহেলাই সমস্যাকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
সমস্যা টের পেলে কী করবেন?
ভুলে যাওয়ার সমস্যাকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। হাসি-ঠাট্টা করে এড়িয়ে যাওয়া বা বয়সের দোষ দিয়ে দায় সারা বিপজ্জনক হতে পারে।
👉 যা করবেন:
-
দ্রুত একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের (Neurologist) পরামর্শ নিন
-
প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন
ডিমেনশিয়া নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকেরা সাধারণত—
-
Mini Mental State Examination (MMSE)
-
রক্ত পরীক্ষা (থাইরয়েড, ভিটামিন বি১২)
-
মাথার MRI বা CT Scan
করতে পারেন।
ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা কি সম্ভব?
ডিমেনশিয়া পুরোপুরি ভালো না হলেও চিকিৎসা আছে এবং সঠিক চিকিৎসায় রোগীর জীবনমান অনেকটাই উন্নত করা যায়।
চিকিৎসা পদ্ধতি
ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত—
১. ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা
ডিমেনশিয়ায় ব্যবহৃত কার্যকর কিছু ওষুধ হলো—
-
ডোনেপেজিল (Donepezil)
-
রিভাসটিগমিন (Rivastigmine)
-
মেমানটিন (Memantine)
রিভাসটিগমিন প্যাচ আকারে ত্বকে লাগানো যায়, যা অনেক ক্ষেত্রে বেশ কার্যকর।
⏳ রোগের শুরুতেই চিকিৎসা শুরু করলে রোগী সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল হওয়া থেকে অনেকাংশে রক্ষা পেতে পারেন।
২. ওষুধ ছাড়া চিকিৎসা
ওষুধের পাশাপাশি কিছু বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
-
সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য
-
পর্যাপ্ত ভিটামিন (বিশেষত B12)
-
বিহেভিয়ারাল থেরাপি
-
অকুপেশনাল থেরাপি
-
নিয়মিত হালকা ব্যায়াম
-
বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা, বই পড়া, গল্প বলা
বর্তমানে স্টেম সেল থেরাপি নিয়ে গবেষণা চলছে, যা ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়া চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
কেন হয় ডিমেনশিয়া?
ডিমেনশিয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে—
-
বয়সজনিত মস্তিষ্কের ক্ষয়
-
থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি
-
ভিটামিন বি১২–এর অভাব
-
মাথায় আঘাত
-
স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে টিউমার
-
আলঝেইমার রোগ (ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ)
ডিমেনশিয়ার প্রভাব
ডিমেনশিয়া একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ধীরে ধীরে অসহনীয় করে তোলে। একসময় রোগী—
-
নিজে খেতে, পরতে বা টয়লেট ব্যবহার করতে অক্ষম হয়ে পড়েন
-
আজীবনের শেখা অভ্যাস ও পরিচিত মানুষদের চিনতে ভুলে যান
এটি শুধু রোগীর নয়, পুরো পরিবারের জন্যই মানসিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
উপসংহার
ভুলে যাওয়া সব সময় স্বাভাবিক নয়। সময়মতো সচেতনতা ও চিকিৎসাই পারে ডিমেনশিয়ার ভয়াবহতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে। পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরে না গেলেও, রোগের অগ্রগতি ধীর করে একজন স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষকে পরিবার ও সমাজে তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে সাহায্য করা সম্ভব।
👉 স্মৃতি হারানোর আগেই সচেতন হোন—কারণ স্মৃতি মানেই জীবন।

0 Comments